মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা, ( পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এবং পরবর্তীতে শান্তি বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা) ১৯৭০ এর প্রাদেশিক গণপরিষদ নির্বাচনে যে সাতজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পরে ৭২- এর খসড়া সংবিধানের বিরোধিতা করেন এই প্রশ্ন তুলে যে, এখানে অবাঙালিদের স্বীকৃতি দেওয়া হয় নাই এবং বাঙালি সংস্কৃতিকে আধিপত্য দেওয়া হয়েছে। এই মর্মে চার দফা দাবি পেশ করেন কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান তার চার দফা আমলে নেন না তাই ঐ বছর ৩১ অক্টোবর লারমা সংসদ ত্যাগ করেন। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বলেন,
❝কোনও সংজ্ঞা বা যুক্তির অধীনে একজন চাকমা বাঙালি বা একজন বাঙালি চাকমা হতে পারে না। পাকিস্তানে বসবাসকারী কোনও বাঙালিকে পাঞ্জাবি, পাঠান বা সিন্ধি বলাও যায় না ও হতেও পারে না এবং তাদের মধ্যে যারা বাংলাদেশে বাস করেন তাদের কাউকেও বাঙালি বলা যায় না। বাংলাদেশের নাগরিক হিসাবে আমরা সকলেই বাংলাদেশি তবে আমাদের আলাদা জাতিগত পরিচয়ও রয়েছে, যা দুর্ভাগ্যক্রমে আওয়ামী লীগের নেতারা বুঝতে চান না… ❞
এই সংকটের সমাধানের পথে না গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান গেলেন ধামাচাপা দেওয়ার পথে ১৯৭৩ সালের জাতীয় নির্বাচনে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা আবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসলেন শেখ মুজিব সরকার তাকে বাংলাদেশ সরকারের সংসদ প্রতিনিধি হিসেবে কমনওয়েলথ সম্মেলনে প্রেরণ করার মাধ্যমে লারমা কর্তৃক উদ্ভূত জাতীয় সংকটকে ধামাচাপা দেওয়ার পথে হাঁটলেন। এই সেটেলমেন্ট যে সাসটেইনেবল সেটেলমেন্ট হচ্ছে না এটা না বুঝতে পারাটা ছিলো শেখ মুজিবুর রহমানের অদূরদর্শীতা। ১৯৭৫ সালের ১৫-ই আগস্ট শেখ সাহেব সপরিবারে নিহত হলে, পরের দিন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা পালিয়ে পাহাড়ে চলে যান এবং জনসংহতি সমিতি’র সশস্ত্র শাখা শান্তিবাহিনী গঠন করেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে আমাদের একটা নতুন জাতীয়তাবোধের জন্ম হয়। ‘৭১ এর বিপ্লব বেহাত করার মধ্যদিয়ে শেখ মুজিব সরকার সর্বপ্রথম হত্যা করেছে সেই অমোঘ জাতীয়তাবোধ, যে জাতীয়তাবোধ এই দেশের হিন্দু-মুসলিম, খ্রিস্টান, বোদ্ধ, পাহাড়ি, সমতলের অধিবাসী সকলকে একত্রিত করেছিল অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের মাঠে। যে জাতীয়তাবোধ পাহাড়িকে আর সমতলের অধিবাসীকে একসঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল স্টেনগান কাঁধে লড়াইয়ের ময়দানে। এখানে অ্যান্থ্রপোলোজিকাল ইথনিসিটি (Anthropological Ethnicity) কোন ব্যারিয়ার হয় নাই। সেটা বুঝতে পারেন নাই শেখ মুজিবুর রহমান এই জন্য উনি সবাইকে বাঙালি বানানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন। ১৯০৫ সালে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল ‘পূর্ব বাংলা ও আসাম ‘ নিয়ে একটি নতুন প্রদেশ হলেও এখানের জাতীয়তাবোধের ভিত্তি ছিল কেবল মাত্র ধর্ম একথা ঠিক নয়; বরং জাতীয়তাবোধের মূল ভিত্তি ছিলো মজলুমিয়াত। ১৯০৫ সালে এখানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৯% জনগণ ছিলো নিন্মবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের। এই হিন্দু সম্প্রদায় ও মুসলিম সম্প্রদায় উভয় শ্রেণী কলকাতার এলিট হিন্দু তথা জমিদার সম্প্রদায় কর্তৃক নিপীড়িত ছিলেন আর এই মজলুমিয়াতই ছিল এখানের জাতীয়তাবোধের ভিত্তি। এই পূর্ববঙ্গ আলাদা হওয়ার কারণে সবচেয়ে ক্ষতির মুখে পরে জমিদারি ব্যাবসা, আইন ব্যাবসা সহ কলকাতা কেন্দ্রিক সকল ব্যাবসায়। এখন পুরাতন ব্যাবসা ক্ষেত্র ফিরে পেতে কলকাতার এলিট জমিদাররা এই অঞ্চলে প্রচার করতে লাগলো এই ভাগ ইসলাম ধর্মের বিজয় আর বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদ এইসব বয়ান প্রচার করে মজলুমিয়াতের ভিত্তিতে গড়ে উঠা জাতীয়তাবোধকে বিভাজনের মাধ্যমে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করতে সক্ষম হন। ধর্মের ভিত্তিতে আমাদের মধ্যে যে রাষ্ট্র আমরা পেয়েছিলাম সেখান থেকে বেড় হতেই ‘৭১ সালে আমাদের সংগ্রাম ছিলো বটে তবে সেই সংগ্রাম কোন নতুন জাতিগত বিভাজন তৈরির জন্যও হয় নাই। ‘৭১ এর সংগ্রাম যে আমাদের জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম এবং সেই জাতীয়তাবোধ শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পারেন নাই বলেই উনি রাষ্ট্রের সকল অ্যান্থ্রপোলোজিকাল ইথনিসিটি (Anthropological Ethnicity) -কে বাঙালি বানানাতে গিয়ে রাষ্ট্রকে জাতিগত বিভেদের মধ্যে ফেলেছেন। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার বক্তব্যে উনি নিজেকে বাংলাদেশী নাগরিক স্বীকার করেন তবে বাঙালি নন নিজেকে চাকমা বলে পরিচয় দিতে চান। আর এই কারণেই যে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ আলাদা হলো সেটা সম্ভবত শেখ সাহেব ঠিকঠাক করে বুঝতে পারেননি যার ফলস্বরূপ উনি ৭১ এর মহান বিপ্লবকে হত্যা করে, ত্রিশ লক্ষ জীবনের বিনিময়ে প্রাপ্তি শুধু ‘মুজিবের হাতে ক্ষমতা’ করে দিলেন। অর্থাৎ এতো বিশাল সংগ্রাম পরিনত হলো জাস্ট রেজিম চেঞ্জ মুভমেন্টে! শেখ মুজিবুর রহমান পারতেন বাঙালি নৃগোষ্ঠীর সাথে সাথে অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়ে ‘৭১ এর মধ্য দিয়ে আমাদের যে নতুন জাতীয়তাবোধ তৈরি হয়েছে যে,
“আমরা ধর্মের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে একটা স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র, বাংলাদেশ, প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছি। যারা কালচারালি, পলিটিকালি ও ইকোনমিকালি কলকাতা কেন্দ্রিক বাংলা ভাষাভাষীদের রাষ্ট্র পশ্চিমবঙ্গ থেকে স্বতন্ত্র এবং আমাদের জাতীয়তাবাদের ভিত্তি আমাদের ভৌগোলিক সীমানা, বাংলাদেশ।”
কিন্তু শেখ সাহেব সেটা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন নাই বরং হত্যা করেছেন ‘৭১ এ অর্জিত মহান বিপ্লবকে। এখান থেকেই আজকে আইডেন্টিটি ক্রাইসিস তৈরি হচ্ছে, আদিবাসী নাকি উপজাতি নাকি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী!
আদিবাসী না ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী না উপজাতি? এই শাব্দিক সংকটের জন্য দায়ী শেখ মুজিবুর রহমানের অদূরদর্শীতা।
-মো. বিল্লাল হোসেন
Leave a Reply