এইলেখাটা লেখার পেছনে একজন যুবলীগ নেতার স্টাটাস দেখে অনুপ্রাণিত হইছি। উনি প্রশ্ন তুলেছেন মুক্তিযুদ্ধে আলেম সমাজের ভুমিকা কি? আমার জানামতে তারা নিজেদের দলের ইতিহাসটুকুই ভালো করে জানতে চায় না। যে দলের প্রতিষ্ঠাতা একজন মাওলানা(ভাসানী)। আরেকজন শীর্ষ পর্যায়ে নেতা ছিলেন মাওলানা। যিনি মাওলানা তর্কবাগীশ নামে অধিক পরিচিত। সে দলের কর্মীরা মুক্তিযুদ্ধের উন-পঞ্চাশ বছর পরে প্রশ্ন তুলেন মুক্তিযুদ্ধে মাওলানাদের অবদান কি?
ছয়দফা আন্দোলনের একজন অন্যতম অগ্রনায়ক ছিলেন মাওলানা অলিউর রহমান। সিলেটের মাওলানা দার্শনিক বুদ্ধিজীবী অলিউর রহমান ছয়দফাকে বাস্তবায়নের জন্য লিখেছেন একাধিক বই ‘ইসলামের দৃষ্টিতে ছয়দফা’, ‘শরীয়তের দৃষ্টিতে ছয়দফা’, ‘ছয়দফা ইসলাম বিরোধী নয়’, ‘যুক্তির কষ্টি পাথরে ছয়দফা’। শুধু বই লিখেই ক্ষান্ত হন নাই আলেমদের নিয়ে ছয়দফার স্বপক্ষে সভা করেছেন। ছিলেন ধর্ম মন্ত্রণালয়ের স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রস্তাবকারী। এই বিষয় বই লিখেছেন “স্বতন্ত্র ধর্মদপ্তর একটি জাতীয় প্রয়োজন”। মাওলানা অলিউর রহমান একজন শহীদ বুদ্ধিজীবী ১৯৭১ সনে ১৪ই ডিসেম্বর পুরান ঢাকার লালবাগ থেকে তাকে ধরে নিয়ে যায় আলবদররা। দুঃখের বিষয় এই স্বাধীনতার অগ্রনায়কের কথা কোনো এক অজানা কারণে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের লিষ্টে নাই। আরো অসংখ্য আলেমদের অবদানের কথা উল্লেখ করে শাকের হোসাইন শিবলি গবেষণামুলক বই লিখেছেন “আলেমদের মুক্তিযুদ্ধের খুঁজে”।
মুক্তিযুদ্ধে আলেম সমাজের অবদান নিয়ে তারেক মুহম্মদ তওফীকুর রহমান তার “বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলেম সমাজের ভুমিকা” বইতে লিখেছেন, ‘সেই সময়ে বাংলাদেশের আলেম সমাজকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তারা ছয় ধারায় বিভক্ত ছিলেন।
১.বিভিন্ন ইসলামী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আলেম।
২.বিভিন্ন সাধারণ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আলেম।
৩.সরকারি-আধা সরকারি মাদ্রাসাগুলোর শিক্ষক আলেম।
৪.কওমি সাদ্রাসাগুলোর শিক্ষক আলেম।
৫.বিভিন্ন খানকাহ, সিলসিলা ও পীর-মুরিদী সংশ্লিষ্ট আলেম
৬.ইমাম, মুয়াজ্জিন ও ব্যক্তি পর্যায়ের আলেম।
এ ধারাগুলোর মধ্যে ইসলামপন্থী দলে “জামায়াতে ইসলামী ও নেজামে ইসলামের” বাইরে আলেম সমাজের এক বিশাল অংশ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সক্রিয় অবস্থান করেন। এদের মধ্যে অনেকেই রণাঙ্গনে সক্রিয় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন, অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য খেতাবপ্রাপ্ত হন।’
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ একজন পবিত্র কুরআনের হাফেজ। মুক্তিযুদ্ধে তাজউদ্দীনকে অস্বীকার করার সামর্থ্য কারো আছে।
শাকের হোসাইন শিবলী তার “আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোঁজে” নামক বইতে আরো উল্লেখ করেন মাওলানা ইমদাদুল্লাহ আড়াইহাজারী মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কী করবেন এ ব্যাপারে প্রখ্যাত আলেম আল্লামা হাফেজ্জী হুজুরকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “পাকিস্তানিরা বাঙালিদের ওপর অত্যাচার করেছে, সুতরাং তারা জালেম। জুলুম আর ইসলাম এক হতে পারে না। তুমি যদি মুসলমান হও তবে পাকিস্তানিদের পক্ষে যাও কীভাবে? এটা তো জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের প্রতিবাদ প্রতিরোধ”। তারপরও আলেমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন না।
উল্লেখ্য ‘জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম’ পাকিস্তানের সেক্রেটারি মুফতি মাহমুদ সব সময় বাঙালি মুসলমানদের পক্ষে ছিলেন। ২৬ মার্চের আগে তিনি ঢাকায় এসে এ অংশের নেতাদের বলে দিয়েছিলেন, ‘আপনারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলুন, দেশের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য উৎসাহিত করুন।’ সে সময় অনেক আলেম তাদের সাধ্য মতো মুক্তিযুদ্ধাদের সাহায্য করেছেন।
এছাড়াও বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সার্টিফিকেটধারী যেসব আলেমরা আছেন- মাওলানা আবদুল্লাহ বিন সাঈদ জালালাবাদী, মাওলানা আবদুস সোবহান, মাওলানা দানেশ, মাওলানা আতাউর রহমান খান, মাওলানা আহমাদুল্লাহ আশরাফ, মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, মাওলানা ইমদাদুল্লাহ আড়াইহাজারী ও মাওলানা ফরিদউদ্দীন মাসউদ প্রমুখ। আরো কতোজন মাওলানা লাগবে? যারা এখনো শুধু মাওলানা হওয়ার কারণে তাদের মুক্তিযুদ্ধের অবদানকে অস্বীকার করেন। পরিশেষে একটি কথাই বলতে চাই কারো অবদানকে অস্বীকার করে কখনো ইতিহাস রচিত হতে পারে না।
বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত আলেমদের অবদান অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। যারা এই আধুনিক যুগেও নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় আলেমসমাজকে ছোট করে দেখছেন। তাদের অবদানকে অস্বীকার করে জুলুম নির্যাতনের মাধ্যমে দমিয়ে রেখে ক্ষমতা আরোহণের পথ সুগম করতে চাচ্ছেন। বর্তমান সমাজে সেটা কতটা বাস্তব একটু ভেবে দেখা দরকার।
আবুল বাশার।
Leave a Reply